শেষ পর্যন্ত তৃণমূলের আসন দাঁড়াল ২২ আর বিজেপির ১৮। AndNewsBD
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির রেকর্ড, মমতার জন্য অশনি সংকেত?
দিল্লির দৌড় শুরু হয়েছিল 4২-এ 4২ আসন দখল ডাকে। শেষ পর্যন্ত তৃণমূলের আসন দাঁড়াল 22 আর বিজেপি 18। কোন সন্দেহ নেই, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কাছে এই ফল এক বড় সতর্কতা। কারণ শুধু আসন সংখ্যার নিরিখেই নয়, ভোটের ধরনেও মেরুকরণ ছবি স্পষ্ট।
এই মেরুকরণকে নিছক সাম্প্রদায়িক বললে হবে না। এ কথা ঠিক আছে, মমতা সব সময়ই সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়িয়ে। তার দিক থেকে বিজেপি হিন্দুত্বের রাজনীতির মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে 30 শতাংশ সংখ্যালঘু ভোট নিজেদের দিকে টেনে রাখা প্রয়োজন, এটিও হয়তো একেবারেই অস্বীকার করা যায় না।
কিন্তু এর বাহিরে আরো একটি মেরুকরণ এখন স্পষ্ট। যা অনেক বেশি রাজনৈতিক। সিপিএম এবং কংগ্রেস কার্যত মুছে ফেলা হয়েছে। সিপিএম একটি আসনও পেয়েছে। ভোট মাত্র 8 শতাংশ। কংগ্রেস দুইটি আসন পেলেও ভোট 6 শতাংশও নয়। অর্থাৎ শাসক ও বিরোধী ভোট সরাসরি দুটি শিবের ভাগ হয়ে গেছে। যার অর্থ ২0২1-এ বিধানসভার যুদ্ধ হবে মুখোমুখী বিজেপির সঙ্গে তৃণমূল।
এবারের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে ভোট শতাংশে এখন উভয়ই ব্যবধান দাঁড়ায় 3। তৃণমূল 43, বিজেপি 40। ২016 এর বিধানসভার চেয়ে এবারের লোকসভায় তৃণমূলের ভোট প্রায় ২ শতাংশ কমিয়েছে। আর বিজেপির ভোট বেড়েছে 30 শতাংশ।
বিধানসভার 8 কেন্দ্রের উপনির্বাচনেও বিজেপি ভোটে তৃণমূলকে ছাপিয়ে গেছে। চারটি আসনে জয়ী বিজেপি পেয়েছে 40 দশমিক 50 শতাংশ ভোট, তিন আসনে জয়ী তৃণমূল পেয়েছে 37 দশমিক 4 ভোট। একতে জিতেছে কংগ্রেস।
মমতার পক্ষে এসব হিসাব সুস্বাস্থ্যকর নয়। বরং 20২1 এর জন্য এ এক 'অশনি সঙ্কেত'। তবে প্রশ্ন, তিনি কিভাবে দেখবেন? আদৌ বিপদ বলে মানবেন কি?
প্রাথমিক বিশ্লেষণে তৃণমূল নেত্রী মনে করেন, দেশজুড়ে বিরোধীদের অবস্থা, তার তুলনায় এ রাজ্যে তৃণমূলের ফল খারাপ নয়। পাশাপাশি, তার অভিযোগ বিজেপি টাকা খেলা, কেন্দ্রীয় বাহিনী ভূমিকা, ইভিএম কারচুপির মত বিষয়ও এড়িয়ে যাওয়া। তাই কংগ্রেসের সভাপতি রাহুল গান্ধী নিজের দলের পরাজয়কে 'আমার দায়ি' বলে স্বীকার করেন নিলেও মমতার 'আমিত্ব' তাকে এখনো কোনো উপলব্ধি নেই।
বাম এবং কংগ্রেসকে কোণঠাসা করে বিজেপি যে রাজ্যে প্রধান বিরোধী শক্তি হয়ে উঠেছে, তা অবশ্যই অবশ্য গত কয়েকটি উপনির্বাচনার ফলই বোঝা যাচ্ছে। এমনকি, এবারও লসসভাতেও যে তারা দ্বিতীয় স্থানে থাকবে, সন্দেহ ছিল নাও। কিন্তু সেই উত্থান এত তীব্র হয়ে প্রায় সমান সমানে টক্কর চেহারা নেবে যে অনেক বোঝেনি। তাই বুথফেরত সমীক্ষার পূর্বাভাস নিয়েও দোলাচল ছিল। স্বয়ং মমতাও বার বার হিসাব কাশে 'আশ্বস্ত' ছিল, যতটা বলা হচ্ছে, বিজিপি ততটা বাড়বে না।
বিজেপি শুধু বেড়েছে তাই নয়, রাজ্যের ২7 টি গ্রামীণ ভোসভায়া কেন্দ্র 15 টি এগিয়ে এগিয়েছে। রাজ্য রাজনীতিতে এটি একটি এক নজরে বিষয়। সিপিএমের বিরুদ্ধে জনমত ঘুরতে শুরু করেছে শহর থেকে। গ্রাম বাংলায় তাদের দুর্গ দীর্ঘদিন প্রায় অটুট ছিল। তাই কংগ্রেস বা পরবর্তীকালে তৃণমূল শহর নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারলেও মূল ভূমিকায় আঘাত হানতে পারে।
কিন্তু ২011 সালে মমতা পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা দখল করার আগে ২009 এর লোকসভা নির্বাচনে গ্রাম বাংলায় সিপিএম পতনের চিহ্ন দেখা যায়। সেবার তৃণমূল পেয়ে 19 টি আসন। বামফ্রন্ট 15 টি। এবার তৃণমূল পেল ২২ আসন আর বিজিপি 18 টি।
শাসক তৃণমূলের উপরে মূল ধাক্কা এল গ্রাম থেকে বাংলা। বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত পাওয়া লোকসভার ফলাফল অনুযায়ী, রাজ্যের ২94 টি বিধানসভা আসনে 1২9 টিতে 'জয়ী' বিজেপি। তৃণমূল 158 টি।
কেন তিনি প্রশ্ন ব্যাখ্যা সম্ভবত একাধিক। তবে, একটি বিষয় অধিকাংশই একমত। সেটি হল, পঞ্চায়েত নির্বাচনে সাধারণ মানুষের ভোট দিতে পারে না। যা গ্রাম ভোটারদের উপর যথেষ্ট বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। যারা ভোট দিতে পারে, তাদের কাছে এই লোকসভা নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল 'সুযোগ' সম্ভবত এক ধরনের উত্তর। তাই গ্রামীণ লোকসভায় তৃণমূলের অগ্রগতি রীতিমতো ধাক্কা খেয়েছে।
যে জায়গায় তৃণমূল নির্দ্বিধায় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পঞ্চায়েত জয়ী পরাজয়ের তালিকায় রয়েছে সেসব এলাকার অনেক লোকসভা কেন্দ্র। যেমন, কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, বালুরঘাট, বনগাঁ, বাঁকুড়া, বিষ্ণুপুর, রানাঘাট, বর্ধমান-দুর্গাপুর, হুগলি, মেদিনীপুর ইত্যাদি।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেন্দ্র ডায়মন্ড হারবারেও প্রায় 90 শতাংশ পঞ্চায়েত আসন বিনা ভোটে দখল করে তৃণমূল। সেখানে নিশ্চয়ই আবেশেকের জয়ের ব্যবধান তিন লাখও বেশি। তবে, আবার ফল ফলন, ববজাজ, বিষ্ণুপুর, মহেশতলার মতো বিভিন্ন স্থানে 'ত্রাসাসে' ভোটে অভিযোগ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন অবশ্য এটা মানেনি।
তৃণমূলের নির্বাচনী ধাক্কা পিছনে আরও একটি বিষয় কাজ করে মনে হচ্ছে। এটি হল দল একাংশের 'দাদাগিরি'। তৃণমূলের যারা সত্য 'তৃণস্তরে' কাজ করে এসেছেন, তাদের একটি বড় অংশ মনে হচ্ছে, 'নব্য' নেতৃত্ব দাপটে তারা আর কোন জায়গা পায়নি। দল তাদের কোন মর্যাদা নেই। নতুনদের দপটের বিরুদ্ধে 'আদি' তৃণমূলের সেই ক্ষোভের প্রতিফলন বহু ক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্র 'বিপ্লব' ঘটিয়েছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
সেই ক্ষোভ বিজেপি যদি আরো উস্কানি দিতে চেষ্টা করে, ২0২1 সালের আগে তৃণমূলের ব্যথা বাড়বে, কমবে না। প্রসঙ্গত, তৃণমূল ছেড়ে আসা 'গদ্দার' বলে অভিহিত মুকুল রায় বৃহস্পতিবার এই ইঙ্গিত দেয়। বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বও বলেছে, তাদের সঙ্গে বা তৃণমূল প্রায় 50 জন বিধায়ক যোগাযোগ করেছেন।
এ কথায় সত্যতা প্রমাণ করা সম্ভব নয়। তবে এই পরিস্থিতিতে তৃণমূলের চাপ কিছুটা বেড়ে যায়। এটাও বিজেপির হিসেব কৌশল। বিজেপি অবশ্যই অবশ্যই চেষ্টা করবে যাতে বিধায়কদের মধ্যে 'ভাঙন' ধরা সম্ভব। এক বিজেপি নেতা বলেন, তৃণমূল যেভাবে অন্য দল থেকে বিধায়ক ভাঙিয়ে আনা, এই কৌশল তার বদলা হবে।
সাধারণ নিয়মে বিধানসভার ভোট হবে আরও দুই বছর পর। সদা পরিবর্তনশীল রাজনীতি ততদিনে কী কী মোড় নেবে তা নিশ্চিত করে কেউ এটা বলতে পারে না। সবাই জানে, ধাক্কা খেতে ঘুরে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা মমতার বন্দ্যোপাধ্যায়ের আছে এবং সে বার বার সফল হয়েছে। এটাই পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস।
তাই এবারও লোকসভা ভোটের ফলাফল বিচার করে সে কী পদক্ষেপ নেবে, দলের আন্ডারে ক্ষমতার 'পুনর্বিবেচনা' দ্বারা সংযত হওয়া ক্ষোভের নিরসন কি না, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প সুফল যাতে মধ্যপথে হারিয়ে যায়, তা নিশ্চিত করুন কি না, নতুন নেতৃত্বের দাপটে কড়া হাতে লাগানো টানবেন কি না, এই অনেক কিছু নির্ভর করবে তৃণমূলের ভবিষ্যৎ।
সর্বোপরি বাকি ধর্মীয় মেরুকরণ ভোট। যা এরাজ্যেও বেশ চোখে পড়েছে। বিভিন্ন জেলাতে তো আছেই, খাস কলকাতাতেও এলাকাভিত্তিক কারণে সে ছবিটি ধরা পড়েছে। রাসবিহারী, ভবানীপুর, জোড়াসাঁকো, শ্যামপুকুর, মানিকতলার মতো এলাকায় তৃণমূল ধাক্কা খেলেও পার্ক সার্কাস, বালিগঞ্জ, কসবা, এন্টালি, চৌরঙ্গীর মত পাড়ায় বিজেপিকে তারা পিছনে পড়ে যায়।

No comments