পঞ্চগড়ে রাতারাতি গড়ে উঠেছে ‘তুফান পীরের মাজার’ || AndNewsBD

গাছের অলৌকিক ক্ষমতায় গড়ে উঠেছে মাজার। 


একটি গাছের গোড়াসহ বেশ কিছু জায়গায় লালসালু কাপড় দিয়ে ঘিরে রেখে রাতারাতি গড়ে ওঠা এই মাজারে জ্বলছে আগরবাতি, মোমবাতি। ‘তুফান পীরের মাজার’ নাম দিয়ে গড়ে ওঠা এ মাজারে খাদেম ও মুরিদও গড়ে উঠেছে। ‘নিয়ত করলে ফল মিলবে’ মাজারে লিখে রাখা হয়েছে কাগজে।
পঞ্চগড়ে রাতারাতি গড়ে উঠেছে ‘তুফান পীরের মাজার’  AndNewsBD

পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার সোনাহার মল্লিকাদহ ইউনিয়নের গজপুরী গ্রামে আরেকটি লালসালু মাজারের জন্ম হয়েছে। এ যেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সেই লালসালু উপন্যাসের মত আরেক মজিদের আবির্ভাব। টাকা-পয়সা, গোলাপ জল, আগরবাতি, মোমববাতি পড়ছে প্রতিনিয়ত। আকস্মিক এই মাজার গড়ে ওঠার খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ লোকজনের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনাও শুরু হয়।

এলাকায় গিয়ে জানা গেছে, গত ১৭ মে দেবীগঞ্জ উপজেলার সোনাহার মল্লিকাদহ ইউনিয়নের গজপুরী গ্রামের তোফাজ্জল হোসেনের একটি পিঠালী বা গামার গাছ ঝড়ে রাস্তার ওপর পড়ে যায়। এতে রাস্তা বন্ধ হয়ে গেলে গাছের মালিক তাৎক্ষণিক গাছটি স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ী বাবুল হোসেনের কাছে বিক্রি করে দেন এবং কাঠুরিয়া দিয়ে দ্রুত গাছটি কেটে নিয়ে যেতে বলেন। কাঠুরিয়ারা প্রথমে সড়কের উপরে থাকা গাছের ডালপালা কেটে দেয়। ডালপালা কাটার পর গোড়ালির ভর বেশি হওয়ায় গাছটি নিজে থেকেই আবার আস্তে আস্তে আগের মতো দাঁড়িয়ে যায়। ওই গাছটি ৫/৬ বছর আগেও আরেক বার একই ভাবে পড়ে গিয়ে উঠে যায়। এসময় কাঠুরিয়ারা ভয়ে গাছ কাটা বন্ধ করে বাড়ি চলে যায়।
পঞ্চগড়ে রাতারাতি গড়ে উঠেছে ‘তুফান পীরের মাজার’  AndNewsBD

গোঁড়ালির মাটির ভারের কারণে গাছটি উঠে গেলে ওই এলাকার মোবারক হোসেনের ছেলে ইসমাইল হোসেন ও স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা মামুন শাহসহ স্থানীয় একটি চক্র গাছের অলৌকিক ক্ষমতার কারণে গাছটি নিজে নিজে উঠে দাঁড়িয়েছে বলে প্রচার শুরু করে। রাতারাতি ওই চক্রটি লালসালু কাপড় দিয়ে ঘিরে তুফান পীরের মাজার বলে এলাকাবাসির মাঝে ভুল তথ্য দিয়ে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা চালায়। আর খাদেম হিসেবে ইসমাইল এবং মুরিদ হিসেবে স্থানীয় কিছু মানুষ মাজার দেখাশোনা করে। গ্রামের সহজ সরল বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ অন্ধ বিশ্বাসে মাজারে মানত করা শুরু করে। দূর-দূরান্তের মানুষ কথিত মাজারে এসে মানত করছে টাকা পয়সা দান করছে। স্থানীয়রা যাতে এটাকে কেন্দ্র করে কোন ফায়দা লুটতে না পারে এজন্য প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন এলাকাবাসী।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, মাজারে প্রতিনিয়ত লোকজন এসে দেখে যাচ্ছেন। এখানে মোমবাতি আগরবাতি জ্বলার দৃশ্য দেখা গেছে। কিছু টাকা পয়সা দেখা গেছে। তবে সকালে ও সন্ধ্যায় এখান থেকে কেউ টাকা নিয়ে যান বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

গাছের মালিক তোফাজ্জল হোসেন জানান, ঝড়ে গাছটি পড়ে যাওয়ায় আমি সেটি বিক্রি করেছি। কিন্তু কাঠুরিয়ারা ভয়ে গাছটি কাটছে না। পরে কে বা কারা লালসালু কাপড় দিয়ে মাজার করেছে তা আমি বলতে পারবো না।

কাঠুরিয়া জাকিরুল ইসলাম জানান, গাছের ডালগুলো কাটার পর গাছটি আবার দাঁড়িয়ে গেলে আমরা আর সেটি না কেটে বাড়ি ফিরে যাই। পরে এসে দেখি লাল কাপড় দিয়ে ঘেরা দিয়ে তুফান পীরের মাজার করা হয়েছে।

স্থানীয় এলাকাবাসি নুর ইসলাম, ট্রাক ড্রাইভার মানিক, যুবক অরুণ রায়, আনারুল ইসলাম, ইয়াকুব আলী জানান, এখানে প্রাচীণ কোন কিছু ছিল না এখনও নেই। কোনকালে কবরও ছিল না। তারপরও রাতারাতি কিভাবে এটি মাজারে পরিণত হল এটা আমরা বুঝতে পারছি না। তবে ধর্মকে পুঁজি করে টাকার লোভে একটি চক্র ব্যবসা করার পাঁয়তারা করছেন। 

দেবীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের ছাত্র আরিফুল ইসলাম জানান, একটি চক্র মানুষকে প্রতারিত করার জন্যই মাজারের নাম দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছে। এটা বন্ধ না হলে এলাকার দরিদ্র মানুষ প্রতারণার শিকার হবেন। মাজারের কথিত খাদেম ইসমাইল হোসেনকে এলাকায় গিয়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রত্যয় হাসান জানান, একটি গাছকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কিছু কুসংস্কারাচ্ছন্ন লোক ব্যবসায়িক কিংবা অন্ধ বিশ্বাসে তুফান পীরের মাজার নাম দিয়ে মাজার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে আমরা আইনশৃংঙ্খলা বাহিনী, জনপ্রতিনিধিসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে আলোচনা করছি। আমরা স্থানীয়দের সচেতন করে কথিত মাজার প্রতিষ্ঠা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করছি। তারপরও যদি তারা সরে না আসে তাহলে আইনানুগভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

No comments

Powered by Blogger.