দীর্ঘ ১০ বছরেও সংস্কার হয়নি ক্ষতিগ্রস্ত পাউবো’র ভেড়িবাঁধ || AndNewsBD
আজ ২৫ মে ঐতিহাসিক আইলা দিবস।
ঠিক ১০ বছর আগে এই দিনে তিল তিল করে গড়ে তোলা উপকূলীয় এ জনপদের মানুষের ছোট ছোট স্বপ্নগুলোকে মুহূর্তের মধ্যে নোনা জলে ভাসিয়ে নিয়ে যায় ভয়ঙ্কর সর্বগ্রাসী আইলা। এই দিনে কেউ হারিয়েছিল সহায়-সম্পদ, কেউবা স্বজন। সহায়-সম্পদ হারানোর কথা অনেকে ভুলতে পারলেও স্বজন হারানোর কথা কেউ ভুলতে পারেনি। এ জনপদের মানুষের দিনটি ভোলার কথা নয়। তাইতো এইদিনে এ জনপদের মানুষ সেই বিভীষিকাময় দৃশ্যের কথা ভেবে আজও আতঙ্কে ওঠে। নতুন প্রজন্নের কাছে অতি কষ্টে তুলে ধরে হৃদয়ে গুমরে থাকা বোবা কান্না। কারণ সেদিন তো সবাই সমান পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, কে শুনতো কার কষ্টের কথা। তারা জানে না কতদিন বয়ে বেড়াতে হবে সব হারানোর ব্যথা।
১০ বছর আগে, ২০০৯ সালের এই দিনে বঙ্গোপসাগর থেকে নেমে আসা জলোচ্ছাস ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট সর্বনাশা ‘আইলা’ আঘাত হানে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জনপদে। মুহূর্তের মধ্যে খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকার ভেড়িবাঁধ লন্ডভন্ড হয়ে লোকালয় প্লাবিত হয়। স্বাভাবিকের চেয়ে ১৪-১৫ ফুট উচ্চতায় সমুদ্রের পানি এসে নিমিষেই ভাসিয়ে নিয়ে যায় এলাকার নারী ও শিশুসহ কয়েক হাজার মানুষ, হাজার হাজার গবাদি পশু, ঘরবাড়িসহ অসংখ্য ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ক্ষণিকের মধ্যে গৃহহীন হয়ে পড়ে হাজারো পরিবার। কয়েক লক্ষ হেক্টর চিংড়ি ঘের ও ফসলের ক্ষেত তলিয়ে যায়।
সর্বনাশা ‘আইলা’র আঘাতে ঐ দিনই শুধু কয়রায় নিহত হয় ৪৩ জন নারী-পুরুষ ও শিশু, আর আহত হয় সহস্রাধিক মানুষ। ভগ্ন রাস্তার উপর ঝুঁপড়ি ঘর বেঁধে তারা বসবাস করতে শুরু করে। প্রলয়ঙ্করী আইলা আঘাত হানার ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও উপকূলীয় অঞ্চল কয়রার ৬টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় মানুষের হাহাকার এতটুকু থামেনি। দু’মুঠো ভাতের জন্য জীবনের সঙ্গে রীতিমত লড়াই করতে হচ্ছে তাদের। আইলার পর থেকে এসব এলাকায় সুপেয় পানি সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করেছে। খাবার পানির জন্য ছুটতে হচ্ছে মাইলের পর মাইল। আইলা কবলিত এ অঞ্চলের রাস্তাঘাট এখনও ঠিকমত মেরামত হয়নি। বিশাল এ জনপদে দুর্যোগ মুহূর্তে আশ্রয়ের জন্য খুবই কম সংখ্যক সাইক্লোন সেন্টার রয়েছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, আইলার পর ১০টি বছর অতিবাহিত হলেও উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি, উত্তর বেদকাশি, কয়রা সদর, মহারাজপুর ও মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভেড়িবাঁধের উপর মানুষ আজও ঝুঁপড়ি বেঁধে বসবাস করছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়ে শত কষ্টের মধ্য দিয়ে ভেড়িবাঁধকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে তারা। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সহায়-সম্পদ বলতে যা কিছু ছিল তার সবটুকু জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। তাছাড়া ঐ সময়কার নদীর প্রবল ভাঙনে শাকবাড়িয়া, কপোতাক্ষ ও কয়রা নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষের বসতভিটা, আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। গাছপালা শূন্য কয়রা উপজেলার পরিবেশ এখনো সম্পূর্ণ ফিরে পায়নি তার পূর্বের রূপ। যে কারণে শুষ্ক মৌসুমে প্রচন্ড তাপদাহে মানুষের জীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে। লবণাক্ততার কারণে হাজার হাজার হেক্টর ফসলী জমিতে কৃষকরা আজো ঠিকমতো ফসল বুনতে পারছে না। তবে স্থানীয় কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে কয়রার কৃষকরা তাদের জমিতে ফসল উৎপাদন করতে সক্ষম হলেও এখনও লবণাক্ততার গ্রাস থেকে রেহাই পায়নি অনেক এলাকা। আইলা’র ভয়াবহতায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়ন। এলাকায় পা দিলেই ১০ বছর আগে ঘটে যাওয়া আইলার চিহ্ন এখনও স্পষ্ট দেখা যায়, যা দেখে না দেখা মানুষও অনুমান করতে পারবে ২৫ মে, ২০০৯-তে সেখানে কি ঘটেছিল। বর্তমানে এ এলাকায় বসবাসরত মানুষের চোখে মুখে এখনও স্পষ্ট সেদিনের ভয়ঙ্কর সেই স্মৃতি। সর্বনাশা আইলায় হারেজখালি, খাসিটানা, ছোট আংটিহারা ও পদ্মপুকুর এলাকার ভেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় এলাকা। নদী ভাঙনের সেই হারেজখালি ক্লোজার এখনও ঠিক হয়নি।
আইলার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও এ জনপদের মানুষের যাতায়াতের পথের খুবই নাজুক অবস্থা। বর্ষার দিনে এ এলাকার মানুষের নৌকা ও ট্রলার একমাত্র ভরসা। আইলায় নোনা পানিতে তলিয়ে থাকায় জমিতে কৃষি ফসল ও চিংড়ি উৎপাদন বন্ধ থাকায় গোটা এলাকা জুড়ে কাজের সুযোগ কমে গেছে। যে কারনে সেই সময় থেকে অনেকেই এলাকা ছেড়েছে।
যাদের অধিকাংশই আজও তাদের বাস্তভিটায় ফিরে আসতে পারেনি। এছাড়া ইউনিয়নটির অধিকাংশ এলাকার ভেড়িবাঁধের অবস্থা খুবই খারাপ। বর্ষা মৌসুমে ভেড়িবাঁধ টিকবে এ ব্যাপারে কারো নিশ্চয়তা নেই। আইলার পর ১০ বছর অতিবাহিত হলেও সমগ্র কয়রা উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপকূল রক্ষা ভেড়িবাঁধগুলোর এখনো কোন সংস্কার হয়নি।
সামান্য ঝড়-বৃষ্টিতে ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হচ্ছে এ জনপদের কয়েক লাখ মানুষকে। এ মুহূর্তে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দু’টি পোল্ডারে ২৫ কিলোমিটার ভেড়িবাঁধ অতি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে উপজেলার ১৪/১ ও ১৩-১৪/২ পোল্ডারের আওতায় ভেড়িবাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো হলো দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের জোড়শিং, খাসিটানা, ছোট আংটিহারা, গোলখালি, মাটিয়াভাঙ্গা, চরামুখা, দক্ষিণ বেদকাশী ও মেদের চর, উত্তর বেদকাশির গাতিরঘেরি, শাকবাড়িয়া, গাব্বুনিয়া, পুটিঘেরী, গাজীপাড়া, কাশিরহাট, কাটমারচর, কাটকাটা ও পাথরখালি এলাকা।
এছাড়া কয়রা সদর ইউনিয়নের গোবরা, হরিণখোলা, গুড়িয়াবাড়ি স্লুইচ গেট, ৪ নম্বর কয়রা লঞ্চঘাট ও মদিনাবাদ তহশীল অফিস। মহারাজপুর ইউনিয়নের লোকা, পূর্ব মঠবাড়ি, দশাহালিয়া, মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের বানিয়াখালি, হড্ডা খেয়াঘাট এলাকা, তেঁতুলতলারচর ট্রলার ঘাট এলাকা।
এর মধ্যে ১৩-১৪/২ নম্বর পোল্ডারে লোকা ও পূর্ব মঠবাড়ি এলাকায় সাড়ে তিন কিলেমিটার এবং ১৪/১ নম্বর পোল্ডারে ৪ নম্বর কয়রা লঞ্চঘাট, গোবরা, ঘাটাখালি, হরিনখোলা, গুড়িয়াবাড়ি স্লুইস গেটের পুর্ব পাশে, জোড়শিং, চরামুখা, ছোট আংটিহারা ও মাটিয়াভাঙ্গা এলাকার সাত কিলোমিটার বাঁধ অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। কয়রা উপজেলায় বসবাসকারী সর্বস্তরের মানুষের বর্তমানে একটাই দাবি টেকসই ভেড়িবাঁধ। আর এ টেকসই ভেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য কয়রাবাসীর পক্ষ থেকে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট জোর দাবি জানানো হয়েছে।

No comments